একাকীত্বের দীর্ঘ পথচলা

একাকীত্বের দীর্ঘ পথচলা


আমার নাম মোঃ আল আমিন। কয়েক দিন আগেই আমার অনার্স জীবন শেষ হয়েছে। এখন শুধু ফলাফলের অপেক্ষা। চার বছরের অনার্স কোর্স শেষ করতে আমার প্রায় পাঁচ বছর লেগে গেছে। এই পাঁচ বছর শুধু পড়াশোনার ছিল না; ছিল অপেক্ষার, হতাশার, ধৈর্যের এবং নিজের সঙ্গে লড়াই করার সময়। এখন প্রতিদিন মনে হয়, কবে ফলাফল প্রকাশ হবে। ফলাফল হাতে পাওয়ার পর কোথায় মাস্টার্স করব, সেটাও এখনো জানি না। আসলে মানুষের পরিকল্পনা অনেক থাকে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী হবে, সেটা একমাত্র আল্লাহই জানেন। তাই প্রতিদিন দোয়া করি, আল্লাহ যেন আমাকে অনার্সে সফলভাবে উত্তীর্ণ করেন এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেন।


ছোটবেলা থেকে আমি খুব বেশি মিশুক ছিলাম না। অনেকের মতো আমার বিশাল বন্ধু মহল ছিল না। স্কুলজীবনে কিছু বন্ধু ছিল, যাদের আমি নিজের খুব কাছের মানুষ মনে করতাম। একসঙ্গে ক্লাস করেছি, মাঠে খেলেছি, পরীক্ষার আগে একসঙ্গে পড়েছি, ভবিষ্যৎ নিয়ে কত স্বপ্ন দেখেছি। তখন মনে হতো, এই বন্ধুত্ব হয়তো সারাজীবন থাকবে। কিন্তু সময় মানুষকে বদলে দেয়। স্কুল শেষ হওয়ার পর সবাই নিজের নিজের জীবনে ব্যস্ত হয়ে গেল। প্রথম দিকে মাঝে মাঝে কথা হতো, পরে সেটাও বন্ধ হয়ে গেল। আজ বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছে, কিন্তু তাদের কারও সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। মাঝে মাঝে মনে হয়, যদি সত্যিই তারা বন্ধু হতো, তাহলে অন্তত একটি ফোন করত, একটি খোঁজ নিত। কিন্তু বাস্তবতা আমাকে অন্য শিক্ষা দিয়েছে—সব পরিচিত মানুষ বন্ধু হয় না, আর সব বন্ধু সারাজীবন পাশে থাকে না।


কলেজের জীবনও শেষ হলো। তারপর শুরু হলো অনার্সের নতুন অধ্যায়। মনে মনে ভাবছিলাম, এবার হয়তো কিছু ভালো বন্ধু পাব। এমন কিছু মানুষ থাকবে, যাদের সঙ্গে শুধু পড়াশোনা নয়, জীবনের সুখ-দুঃখও ভাগ করে নিতে পারব। শুরুতে কয়েকজনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক হয়েছিল। ক্লাসে একসঙ্গে বসা, নোট শেয়ার করা, পরীক্ষা নিয়ে আলোচনা—সবকিছুই ভালো চলছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম, বেশির ভাগ সম্পর্কের ভিত্তি ছিল প্রয়োজন। কারও নোট লাগলে ফোন আসত, কোনো তথ্য দরকার হলে খোঁজ নিত, কোনো কাজ থাকলে পাশে চাইত। কিন্তু আমার কোনো প্রয়োজন বা কষ্টের সময় তাদের কাউকে পাওয়া যেত না। কাজ শেষ হলে সম্পর্কও শেষ হয়ে যেত। তখন বুঝলাম, স্বার্থের ওপর দাঁড়ানো সম্পর্ক কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না।


এই পাঁচ বছরে আমি আরেকটি বিষয় খুব গভীরভাবে অনুভব করেছি—একাকীত্ব। অনেক মানুষে ভরা ক্যাম্পাসে থেকেও আমি নিজেকে একা অনুভব করেছি। ক্লাস শেষ হলে অনেকেই বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যেত, আড্ডা দিত, ছবি তুলত। আমি নীরবে নিজের পথে হাঁটতাম। অনেক সময় ইচ্ছা হতো কারও সঙ্গে মনের কথা বলি, কিন্তু এমন কাউকে খুঁজে পাইনি, যার কাছে নির্দ্বিধায় নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারি।


আমার জীবনে কখনো কোনো প্রেমের সম্পর্কও ছিল না। অনেকেই হয়তো এটাকে অস্বাভাবিক ভাববে, কিন্তু আমি এটাকে কখনো জীবনের ব্যর্থতা মনে করিনি। আমি বিশ্বাস করি, ভালোবাসা জোর করে হয় না। সঠিক সময়ে সঠিক মানুষই জীবনে আসে। তাই এসব নিয়ে আফসোস করার চেয়ে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছি।


তবে একটা কথা সত্যি, মানুষ যতই শক্ত হওয়ার চেষ্টা করুক, একাকীত্ব মাঝে মাঝে তাকে ভীষণ কষ্ট দেয়। এমন অনেক রাত গেছে, যখন ঘুম আসেনি। ভবিষ্যতের চিন্তা, নিজের অবস্থান, পরিবারের প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে মনে হয়েছে, আমি যেন অদৃশ্য এক যুদ্ধের মধ্যে আছি। সেই যুদ্ধের কথা কেউ জানে না, কেউ দেখে না। বাইরে থেকে সবাই ভাবে আমি ভালো আছি, কিন্তু ভেতরের গল্পটা শুধু আমি আর আল্লাহ জানি।



এই দীর্ঘ সময়ে আমি একটি জিনিস খুব ভালোভাবে শিখেছি—জীবনে সবাই পাশে থাকবে, এমন আশা করা ঠিক নয়। মানুষ তার প্রয়োজন অনুযায়ী আসে, আবার প্রয়োজন শেষ হলে চলে যায়। কিন্তু তাই বলে মানুষের ওপর থেকে বিশ্বাস পুরোপুরি হারিয়ে ফেলাও উচিত নয়। কারণ পৃথিবীতে এখনো ভালো মানুষ আছে, সত্যিকারের বন্ধুত্ব আছে, নিঃস্বার্থ সম্পর্কও আছে। শুধু সবাই সেই সৌভাগ্য এক সময়ে পায় না।


আজ আমি যখন নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকাই, তখন দেখি এই পাঁচ বছরে আমি শুধু একটি ডিগ্রির জন্য পড়াশোনা করিনি; আমি জীবনকে চিনতে শিখেছি। মানুষকে চিনতে শিখেছি। সম্পর্কের মূল্য বুঝতে শিখেছি। ধৈর্য কী, অপেক্ষা কী, নীরবে কষ্ট সহ্য করা কী—এসবও শিখেছি।


এখন আমার সামনে নতুন একটি অধ্যায় অপেক্ষা করছে। প্রথমে অনার্সের ফলাফল প্রকাশ হবে। তারপর শুরু হবে মাস্টার্সে ভর্তি হওয়ার নতুন পথচলা। কোথায় ভর্তি হব, কীভাবে ভবিষ্যৎ গড়ব, সেটা আজও নিশ্চিত নই। কিন্তু একটি বিষয় নিয়ে আমি নিশ্চিত—আল্লাহ যেটা আমার জন্য নির্ধারণ করে রেখেছেন, সেটাই আমার জন্য সবচেয়ে উত্তম।


আমি জানি, আমার জীবন অন্য অনেকের মতো রঙিন নয়। আমার কাছে শত শত বন্ধু নেই, প্রতিদিন খোঁজ নেওয়ার মতো মানুষের ভিড় নেই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষীও নেই। কিন্তু আমার একটি বিশ্বাস আছে—মানুষের আসল শক্তি তার ভেতরে থাকে। যে মানুষ একা চলতে শিখে, সে একদিন অনেক দূর যেতে পারে।


আজ যারা আমাকে ভুলে গেছে, তাদের জন্য আমার কোনো অভিযোগ নেই। কারণ প্রত্যেক মানুষের নিজের জীবন আছে, নিজের ব্যস্ততা আছে। তবে আমি চাই, যদি কোনো দিন আমার জীবনে সত্যিকারের কিছু মানুষ আসে, তাহলে আমি যেন তাদের মূল্য দিতে পারি এবং এমন একজন মানুষ হতে পারি, যাকে কেউ স্বার্থের জন্য নয়, মানুষ হিসেবে ভালোবাসবে।


জীবন আমাকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে, আবার অনেক কিছু শিখিয়েও দিয়েছে। হয়তো আজ আমি একা, কিন্তু আমি নিরাশ নই। আমি বিশ্বাস করি, প্রতিটি অন্ধকার রাতের পর যেমন সূর্য ওঠে, তেমনি প্রতিটি কঠিন সময়ের পরও ভালো সময় আসে। তাই আমি অপেক্ষা করছি—একটি ভালো ফলাফলের জন্য, একটি সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য এবং এমন কিছু মানুষের জন্য, যারা সম্পর্কের মূল্য বুঝবে।


আমার গল্প এখনো শেষ হয়নি। বরং মনে হয়, এটাই শুরু। সামনে আরও অনেক পথ বাকি, অনেক সংগ্রাম বাকি, অনেক স্বপ্ন পূরণ হওয়া বাকি। আমি শুধু চাই, আল্লাহ যেন আমাকে সৎ পথে রাখেন, ধৈর্য দেন, পরিশ্রম করার শক্তি দেন এবং এমন একটি জীবন দান করেন, যেখানে সফলতার সঙ্গে সঙ্গে মানসিক শান্তিও থাকবে। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন শুধু ডিগ্রি, চাকরি বা অর্থ নয়; বরং একটি শান্ত হৃদয়, সুন্দর চরিত্র এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি।


Post a Comment

Please Select Embedded Mode To Show The Comment System.*

Previous Post Next Post