Short Note

 আমি মোহাম্মদ আলামিন। আজ আমার অনার্স জীবন শেষ হয়েছে। চারপাশে সবাই ছবি তুলছে, কেউ বন্ধুদের জড়িয়ে ধরে হাসছে, কেউ আবার ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে গল্প করছে। অথচ আমি একা দাঁড়িয়ে আছি। আমার পাশে কোনো বন্ধু নেই, কোনো প্রিয় মানুষ নেই, এমনকি এমন কেউও নেই যে বলবে, "চল, একটা ছবি তুলি।"


চার বছর আগে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম, তখন মনে হয়েছিল নতুন একটা পৃথিবী শুরু হবে। ভেবেছিলাম, এখানে এমন কিছু বন্ধু পাব, যারা শুধু ক্লাসমেট নয়, জীবনের অংশ হয়ে থাকবে। যাদের সঙ্গে রাত জেগে পড়ব, ক্যান্টিনে আড্ডা দেব, পরীক্ষার আগে একে অপরকে সাহস দেব, আর অনেক বছর পরেও একে অপরের খোঁজ নেব।


কিন্তু বাস্তবতা ছিল অন্যরকম।


প্রথম দিকে সবার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। একসঙ্গে ক্লাস করেছি, গ্রুপে কাজ করেছি, হাসাহাসি করেছি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বুঝলাম, বেশিরভাগ সম্পর্কই ছিল প্রয়োজনের। নোট লাগলে ফোন, অ্যাসাইনমেন্ট লাগলে মেসেজ, পরীক্ষার আগে সাহায্য—এসবের জন্য সবাই কাছে আসত। কাজ শেষ হলে আবার সবাই নিজের নিজের পৃথিবীতে ফিরে যেত।


একদিন খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। ভেবেছিলাম, অন্তত একজন বন্ধু ফোন করে জিজ্ঞেস করবে, "কেমন আছিস?" কিন্তু সারাদিন ফোনটা নীরবই ছিল। তখন প্রথমবার অনুভব করলাম, ভিড়ের মধ্যে থেকেও মানুষ কতটা একা হতে পারে।


বিশ্ববিদ্যালয়ের আগেও আমার জীবনে বন্ধুত্বের গল্প খুব সুখের ছিল না। স্কুলে যাদের নিজের মানুষ ভাবতাম, তারা সময়ের সঙ্গে বদলে গেল। কেউ স্বার্থের জন্য কাছে এসেছে, কেউ সুবিধা শেষ হলে দূরে সরে গেছে। একসময় বুঝলাম, যাদের জন্য এত চিন্তা করেছি, তাদের জীবনে আমার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির তেমন কোনো গুরুত্বই ছিল না।


তবুও আমি বিশ্বাস হারাইনি।


ভাবলাম, হয়তো বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে নতুন কিছু উপহার দেবে। কিন্তু চার বছর শেষে দাঁড়িয়ে দেখলাম, সেই গল্পও প্রায় একই রকম।


অনেকেই প্রেমে পড়েছে, কেউ বিয়ের পরিকল্পনা করছে, কেউ প্রিয় মানুষকে নিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে। আমার জীবনে তেমন কেউ কখনো আসেনি। মাঝে মাঝে কারও প্রতি ভালো লাগা জন্মেছিল, কিন্তু সাহস করে কিছু বলতে পারিনি। আবার কখনো বুঝেছি, আমি শুধু একজন পরিচিত মানুষ, তার বেশি কিছু নই।


আজ যখন সবাই ক্যাম্পাসে শেষবারের মতো ছবি তুলছে, তখন আমি দূর থেকে শুধু দেখছিলাম। আমার ফোনের গ্যালারিতে অনার্স জীবনের খুব বেশি স্মৃতি নেই। নেই কোনো গ্রুপ সেলফি, নেই বন্ধুদের সঙ্গে পাগলামির ভিডিও। আছে শুধু নিজের তোলা কয়েকটা ছবি, আর ক্লাসের কিছু নোট।


মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি কি সত্যিই এতটাই অযোগ্য? নাকি আমি মানুষ চিনতে ভুল করেছি?


এই প্রশ্নের উত্তর আজও পাইনি।


সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট থেকে বের হওয়ার আগে শেষবারের মতো পুরো ক্যাম্পাসটা ঘুরে দেখলাম। প্রতিটি ভবন, প্রতিটি করিডোর, প্রতিটি বেঞ্চ যেন আমাকে কিছু বলতে চাইছিল। কত স্বপ্ন নিয়ে এখানে এসেছিলাম! কিন্তু সেই স্বপ্নের অনেকটাই অপূর্ণ রয়ে গেল।


হাঁটতে হাঁটতে লাইব্রেরির সামনে এসে দাঁড়ালাম। মনে পড়ল, কত বিকেল একা বসে বই পড়েছি। বাইরে সবাই আড্ডা দিত, আর আমি ভাবতাম, হয়তো একদিন আমিও তাদের মতো কোনো বন্ধুর সঙ্গে গল্প করব। সেই দিন আর আসেনি।


বাড়ি ফেরার পথে বাসের জানালার পাশে বসে সূর্যাস্ত দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল, জীবনের একটা অধ্যায় শেষ হয়ে গেল। কিন্তু শেষ হওয়া মানেই তো সবকিছু শেষ নয়।


বাড়ি ফিরে আলমারির ভেতর সার্টিফিকেটগুলো রেখে দিলাম। তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই জিজ্ঞেস করলাম, "তুই কি সত্যিই একা?"


মনের ভেতর থেকে একটা উত্তর ভেসে এলো—"হ্যাঁ, আজ হয়তো একা। কিন্তু এই একাকীত্ব চিরদিন থাকবে না।"


সেদিন রাতেই আমি একটা ডায়েরি খুললাম। প্রথম পাতায় লিখলাম—


"মানুষ হারিয়ে যাওয়া মানেই জীবন হারিয়ে যাওয়া নয়। কখনো কখনো একা হাঁটতেই হয়, কারণ সেই পথই আমাদের সবচেয়ে শক্ত মানুষ বানায়।"


তারপর থেকে ধীরে ধীরে নিজের ওপর কাজ করতে শুরু করলাম। নতুন বই পড়লাম, নতুন দক্ষতা শিখলাম, পরিবারের সঙ্গে বেশি সময় কাটালাম। বুঝতে শিখলাম, সুখের জন্য সবসময় অনেক মানুষের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো একজন সৎ মানুষ, একটি সুন্দর স্বপ্ন, আর নিজের প্রতি বিশ্বাসই যথেষ্ট।


অনেক মাস পরে একদিন হঠাৎ স্কুলের এক পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলো। সে বলল, "তোকে অনেক দিন খুঁজেছি।"


আমি শুধু হেসে বললাম, "জীবন সবাইকে ব্যস্ত করে দেয়।"


সেদিন বুঝলাম, সব সম্পর্ক খারাপ হয় না। কিছু সম্পর্ক সময়ের আড়ালে হারিয়ে যায়, আবার কিছু সম্পর্ক নতুনভাবে ফিরে আসে। তবে নিজের সম্মান বিসর্জন দিয়ে কাউকে ধরে রাখার কোনো মানে নেই।


আজও আমার খুব বেশি বন্ধু নেই। আজও কোনো প্রেমের গল্প নেই। কিন্তু আগের মতো আর কষ্ট পাই না। কারণ আমি শিখে গেছি, নিজের মূল্য অন্যের উপস্থিতি দিয়ে মাপা যায় না।


হয়তো আগামীকাল এমন কিছু মানুষের সঙ্গে দেখা হবে, যারা আমাকে কোনো স্বার্থ ছাড়া গ্রহণ করবে। হয়তো হবে না। কিন্তু সেই অনিশ্চয়তা আমাকে আর ভয় দেখায় না।


আজ আমি জানি, জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোই মানুষকে সবচেয়ে বেশি শেখায়। যারা পাশে ছিল না, তারা আমাকে শিখিয়েছে একা দাঁড়াতে। যারা স্বার্থের জন্য এসেছিল, তারা আমাকে মানুষ চিনতে শিখিয়েছে। আর যারা চলে গেছে, তারা আমাকে নিজের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে শিখিয়েছে।


জীবনের শেষ কথা কখনো একাকীত্ব নয়। শেষ কথা হলো আশা। কারণ রাত যতই দীর্ঘ হোক, ভোর একদিন আসেই। আর সেই ভোরে হয়তো নতুন কিছু মানুষ আসবে, নতুন কিছু সম্পর্ক তৈরি হবে, নতুন কিছু গল্প লেখা হবে।


আমি মোহাম্মদ আলামিন। আমার অনার্স জীবন শেষ হয়েছে। হয়তো আমার পাশে আজ কোনো বন্ধু নেই, কোনো ভালোবাসার মানুষও নেই। কিন্তু আমার কাছে এখনও একটি জিনিস আছে—নিজের প্রতি বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাসই আমাকে বলে, একদিন আমার জীবনেও এমন মানুষ আসবে, যারা আমাকে প্রয়োজনের জন্য নয়, মানুষ হিসেবে ভালোবাসবে। সেদিন আমি অতীতের সব কষ্টের দিকে তাকিয়ে শুধু একটি কথাই বলব—"অপেক্ষাটা বৃথা ছিল না।"

Post a Comment

Please Select Embedded Mode To Show The Comment System.*