বিদায় প্রিয় রুম

আজ ৩০ ই জুলাই ২০২৬

ছেড়ে চলে যাচ্ছি স্থায়ীভাবে আমার প্রিয় রুম এবং পড়ার টেবিল ছেড়ে।





জীবনের পথচলায় কিছু মানুষ এবং কিছু সময় চিরদিনের জন্য স্মৃতির পাতায় জায়গা করে নেয়। ছাত্রজীবনের আবাসিক জীবনে একই রুমে বসবাস করার অভিজ্ঞতাও তেমনই এক মূল্যবান অধ্যায়। আমার অনার্স জীবনের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে আমাদের ছোট্ট একটি রুম, যেখানে আমরা একসঙ্গে হেসেছি, কেঁদেছি, সংগ্রাম করেছি এবং অসংখ্য স্মৃতি গড়ে তুলেছি। সালটা ঠিক আনুমানিক ২০২১ সাল হবে। আমি যখন অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তি হই তখন আমি কোথায় থাকবো এরকম একটি রুম খোঁজা শুরু করি। প্রথমে চাইছিলাম একটি ভবনে উঠব এটা হচ্ছে পিটিআই কলেজের কাছে পরে আমার সাথে জয়েন করতে এড হয়েছে রাকিব আর ফাহিদ ওরা ওই দুইজন এবং আমি সর্বমোট তিনজন মিলে ডিসিশন নিয়েছি যে ভোলা একসাথে থাকব এবং একসাথে কলেজে যাব পড়াশোনা করব ।

এরপর চলে গেল কয়েকদিন হঠাৎ আমাদের সিদ্ধান্তই পরিপূর্ণ হলো একই দিনে ওরা দুইজন মিলে আমরা তিনজন ভোলায় গেলাম একই দিনে এরপর আমরা রুম খোঁজা শুরু করলাম।

 যেতে যেতে রাকিবের এক পরিচিত লোক ছিল সেই লোকের মাধ্যমে আমরা চর জংলায় পৌঁছে গেলাম সেখানে একটি প্রাইমারি স্কুল আছে মাস্টার রফিকুল ইসলাম প্রাইমারি স্কুল ওই স্কুলের সামনে ব্যাচেলার বাসা আছে সেখানে গেলাম। যাওয়ার পরে আমরা একটি রুম ভাড়া নিলাম তিনজনে মিলে থাকবো মাসে ১৫০০ টাকা করে। সেখানে যাওয়ার পরে আমি এবং ওরা মিলে একসাথে থাকা শুরু করি। এভাবে চলতে চলতে একদিন ফাহিদ কট খেয়ে একেবারে ভোলা থেকে ঝরে পড়ে চলে যায় ওর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় প্রায় ৩/৪ মাস এখানে থাকার পরে রুম থেকে চলে যেতে বাধ্য হতে হয়। একই সাথে রাকিব সেখান থেকে চলে যাই ঢাকায় চাকরি করার জন্য শুধু সেই রুমে পড়ে থাকলাম আমি একা 

একই সাথে আমি সেই রুম পরিবর্তন করে আরেকটু ভালো রুমে চলে গেলাম সেখানে ছিল চরফ্যাশনের কয়েকজন বড় ভাই একই রুমে। পরে সেই স্কুলের সামনের রুমটাতে আমি একা ওদের সাথে থাকা শুরু করে দেই। যেই রুমটাই শেষ অবধি যেখান থেকে আজকে রুম ছেড়ে দিয়েছি। রুমে আছে যেখানে চরফ্যাশনের আরো চারজন একজন স্থায়ী থাকে আর বাকি তিনজন শুধু পরীক্ষার সময় আসে। যেহেতু ওরা শুধু পরীক্ষার সময় আসে তাই ওই বেড গুলা সব সময় খালি থাকে তাই আমি ওই রুমে উঠে যায় ।

তারপর আমরা স্থায়ীভাবে শুধু এখন দুইজন থাকতেছি আমি এবং মনির ভাই। মনির ভাই খুব ভালো মানুষ এবং ওদের সাথে চরফ্যাশনের বাকি যেই ভাই গুলো ছিল ওই ভাই গুলো খুব ভালো ছিল । আমি ওদের মিস করবো। এরপরে আমি সেই রুমের স্থায়ী ভাবে থাকা শুরু করি। এভাবে চলতে থাকতে থাকতে চরফ্যাশনের বড় ভাইদের এক এক করে বিদায় দিয়ে দিলাম। চলে যায় মনির ভাই আমাকে ছেড়ে দিয়ে বিদায় দিয়ে দিলাম এখন সেই রুমের এডমিন হয়ে গেলাম আমি রুমে লোক সংকট থাকার কারণে মনির ভাই থাকা অবস্থায় আমি এর মাঝখানেই উঠেছিলাম রুমে রাকিবকে । 

রাকিব শেষ হয়ে যাওয়ার পর এরপর স্থায়ীভাবে উঠেছিলাম আমার রুমমেট আবিদ ভাই । আমি যখন অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী, তখন আমার সঙ্গে একই রুমে থাকতেন আবিদ ভাই। তিনি ছিলেন অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। সময়ের পরিক্রমায় আমি যখন তৃতীয় বর্ষে পদার্পণ করি, তখন আবিদ ভাই অনার্স চতুর্থ বর্ষে উঠে যান। আমাদের এই পথচলায় নতুন একজন রুমমেট যোগ দেন, যার নাম জীবন। সে তখন অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। বয়সে ও শিক্ষাবর্ষে আমরা ভিন্ন হলেও একই ছাদের নিচে আমাদের মধ্যে গড়ে ওঠে এক আন্তরিক সম্পর্ক।

কিছুদিন পর আমাদের সঙ্গে যোগ দেয় আরও একজন সদস্য, বাবু। সেও অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিল। বাবু আসার মাধ্যমে আমাদের ছোট্ট পরিবারটি চারজনের হয়ে ওঠে। আমরা চারজন একসঙ্গে প্রায় এক বছর একই রুমে বসবাস করেছি। এই সময়ে একে অপরের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করেছি, পড়াশোনার বিষয়ে আলোচনা করেছি এবং নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নিজেদের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছি। তবে ছাত্রজীবনের মতোই সময় কখনো স্থির থাকে না। এক বছর পর বাবু আমাদের ছেড়ে চলে যায়। তার চলে যাওয়া আমাদের জন্য কিছুটা কষ্টের হলেও জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম মেনেই আমাদের পথচলা অব্যাহত থাকে। বাবু যাওয়ার পরে মাঝখানে ছিল ছোট ভাই কায়েজ। ও মনে হয় ছিল ৩/৪ মাস। এর পর ও চলে যায় ভোলা ছেড়ে। এরই মধ্যে আমাদের সাথে আরো কয়েকজন কিছু দিনের জন্য থাকতে আসত যেমন- মতিন ভাই, সোহেল ভাই এবং সোহাগ ভাই ওরা ছিল শুধু পরীক্ষার সময় ক্ষণস্থায়ী এরপর ওরা বাদ। 

বর্তমানে আমরা তিনজন—আমি, আবিদ ভাই এবং জীবন—একই রুমে বসবাস করছি। দীর্ঘ সময়ের সহাবস্থানে আমরা যেন একটি পরিবারের সদস্যে পরিণত হয়েছি।

আমাদের জীবনযাপনের ধরনও ছিল ভিন্ন। আমি রুমে নিজে রান্না করে খাওয়া-দাওয়া করি। অন্যদিকে, আবিদ ভাই ও জীবন লজিংয়ে পড়ানোর পাশাপাশি সেখানেই খাবার গ্রহণ করে। আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব ও ব্যস্ততা আলাদা হলেও দিনের শেষে আমরা একই রুমে ফিরে এসে গল্প করি, হাসি-আনন্দ ভাগাভাগি করি এবং নতুন দিনের স্বপ্ন দেখি।

জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলোর একটি হলো ছাত্রজীবন। এই সময়ে আমরা শুধু বইয়ের পাতা থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করি না, বরং মানুষকে ভালোবাসতে, একে অপরকে আপন করে নিতে এবং সম্পর্কের মূল্য বুঝতেও শিখি। আমার অনার্স জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলোর একটি জুড়ে আছে আমাদের ছোট্ট একটি রুম, যে রুমটি আজ শুধুই চার দেওয়ালের একটি কক্ষ নয়, বরং আমাদের হাসি-কান্না, সংগ্রাম, ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের এক জীবন্ত সাক্ষী।

এভাবেই একের পর এক দিন, মাস ও বছর পেরিয়ে যাচ্ছে। আমাদের এই ছোট্ট রুমটি শুধু একটি থাকার জায়গা নয়, বরং এটি আমাদের বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, ত্যাগ ও সংগ্রামের এক নীরব সাক্ষী। ছাত্রজীবনের এই স্মৃতিগুলো হয়তো একদিন অতীত হয়ে যাবে, কিন্তু একই রুমে কাটানো দিনগুলোর গল্প আমাদের হৃদয়ে আজীবন অমলিন হয়ে থাকবে।


প্রিয় মানুষগুলো—যাদের আমি আজীবন মনে রাখব

মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্ক রক্তের বন্ধনে গড়ে ওঠে না, তবুও সেগুলো আপন হয়ে যায়। ছাত্রজীবনের কিছু মুহূর্ত এমনই, যা কখনো পুরোনো হয় না। আমার জীবনের তেমনই একটি অধ্যায় হলো সেই প্রিয় রুম এবং সেখানে কাটানো অসংখ্য স্মৃতি। আজ আমি সেই রুম ছেড়ে চলে এসেছি, কিন্তু স্মৃতিগুলো আমাকে কখনো ছেড়ে যাবে না। আমরা ছিলাম তিনজন—আমি, আবিদ ভাই এবং জীবন। দিনের ব্যস্ততা শেষে আমাদের সবচেয়ে প্রিয় সময় ছিল বিকেলের কিছু মুহূর্ত। মাঝে মাঝেই আমরা একসঙ্গে ঘুরতে বের হতাম। হাঁটতে হাঁটতে কখন যে সময় পেরিয়ে যেত, তা বুঝতেই পারতাম না। পথের ধারে কত মানুষ দেখেছি, কত গল্প করেছি! মজার বিষয় হলো, আমাদের নিজেদের কিছু গোপন সংকেত ভাষাও ছিল। যেমন—NA, NAF, NAB, NAL, NAR ইত্যাদি। এই সংকেতগুলোর অর্থ শুধু আমরাই জানতাম। হয়তো অন্য কারও কাছে এগুলো শুধুই কিছু অক্ষর, কিন্তু আমাদের কাছে এগুলো ছিল হাসির খোরাক, বন্ধুত্বের ভাষা এবং অসংখ্য আনন্দময় মুহূর্তের স্মারক।

মাঝে মাঝেই আমরা হেঁটে ভোলা সদর চলে যেতাম। দীর্ঘ সেই পথ আমাদের কাছে কখনো ক্লান্তির ছিল না, বরং ছিল আনন্দের। হাঁটতে হাঁটতে গল্প করা, একসঙ্গে কিছু খাওয়া, ছোট ছোট বিষয় নিয়ে হাসাহাসি করা—এসবই ছিল আমাদের প্রতিদিনের সুখ। কখনো রুমে বসে একসঙ্গে খাবার খেয়েছি, কখনো আবার বাইরে থেকে প্রিয় কোনো খাবার নিয়ে এসেছি। আনন্দগুলো ছিল খুব সাধারণ, কিন্তু অনুভূতিগুলো ছিল অসাধারণ।

শুধু আড্ডাই নয়, আমাদের সময় কেটেছে খেলাধুলার আনন্দেও। কত শতবার যে আমরা একসঙ্গে ক্যারাম বোর্ড খেলেছি কিংবা লুডু নিয়ে বসেছি, তার কোনো হিসাব নেই। কখনো জিতেছি, কখনো হেরেছি, আবার কখনো শুধু হাসতেই খেলেছি। সেই ছোট্ট রুমের প্রতিটি কোণ যেন আজও আমাদের সেই হাসির শব্দগুলো নিজের মাঝে লুকিয়ে রেখেছে।

কিন্তু সময়ের নিয়মে সবকিছুরই পরিবর্তন আসে। আজ আমি সেই প্রিয় রুমটি ছেড়ে চলে এসেছি। হয়তো আর আগের মতো বিকেলে একসঙ্গে ঘুরতে যাওয়া হবে না, রাতের বেলা হেঁটে ভোলা সদর যাওয়া হবে না, কিংবা ক্যারাম বোর্ড আর লুডুর আসরও বসবে না। এই না-হওয়াগুলোই আজ সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।

তবুও আমি বিশ্বাস করি, দূরত্ব কখনো সত্যিকারের বন্ধুত্বকে আলাদা করতে পারে না। আমরা হয়তো ভিন্ন ভিন্ন পথে হাঁটব, কিন্তু আমাদের স্মৃতিগুলো চিরকাল একই থাকবে। যতদিন বেঁচে থাকব, আমি আবিদ ভাই, জীবন এবং আমাদের সেই প্রিয় রুমটিকে গভীর ভালোবাসায় স্মরণ করব। কারণ কিছু বিদায় কখনো বিচ্ছেদ নয়, বরং স্মৃতির পাতায় চিরস্থায়ী হয়ে থাকার আরেকটি নাম।

আমাদের আপনজন—শাওন ভাই

জীবনের পথে চলতে গিয়ে অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়। কেউ কিছু সময়ের জন্য আসে, আবার কেউ অল্প সময়েই হৃদয়ের গভীরে নিজের একটি স্থায়ী জায়গা করে নেয়। আমার ছাত্রজীবনের দীর্ঘ পাঁচ বছরের পথচলায় এমনই একজন মানুষ হলেন শাওন ভাই। তিনি শুধু একজন বড় ভাই নন, তিনি ছিলেন আমাদের অভিভাবক, আমাদের ভরসার জায়গা এবং আমাদের ছোট্ট পরিবারের একজন সদস্য।

আমাদের জীবনের এমন অনেক মুহূর্ত রয়েছে, যেখানে শাওন ভাই নীরবে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। যখনই কোনো সমস্যায় পড়েছি, কোনো দ্বিধায় ছিলাম কিংবা কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হয়েছে, তখনই তাকে পাশে পেয়েছি। তিনি কখনো আমাদের সাহায্য করতে বিরক্ত হননি, বরং নিজের ব্যস্ততার মাঝেও আমাদের জন্য সময় বের করে নিয়েছেন। তার এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও সহযোগিতার কথা হয়তো ভাষায় পুরোপুরি প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

শাওন ভাই আমাদের অনেক সাপোর্ট করেছেন। ব্যক্তিগতভাবে আমাকেও তিনি অনেক সাহায্য করেছেন, যার অবদান আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না। জীবনের কিছু ঋণ অর্থ দিয়ে পরিশোধ করা যায় না, কিছু ভালোবাসার প্রতিদান দেওয়া যায় না। শাওন ভাইয়ের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতাও ঠিক তেমনই। তিনি হয়তো কখনো বুঝতেও পারবেন না, তার ছোট ছোট সহযোগিতাগুলো আমাদের জীবনে কত বড় প্রভাব ফেলেছে।

তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের অসংখ্য স্মৃতি। একসঙ্গে বসে গল্প করা, হাসি-আনন্দ ভাগাভাগি করা, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা কিংবা শুধুই কিছু সময় একসঙ্গে কাটানো—প্রতিটি মুহূর্ত আজ আমার কাছে অমূল্য হয়ে আছে। তিনি আমাদের সময় দিয়েছেন, আমাদের কথা শুনেছেন এবং প্রয়োজনে একজন বড় ভাইয়ের মতো সঠিক পরামর্শও দিয়েছেন। এসব কারণেই তিনি কখনোই আমাদের কাছে বাইরের একজন মানুষ ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন আমাদের রুমের একজন সদস্যের মতো।

আজ বিদায়ের এই মুহূর্তে ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্কের কোনো নাম হয় না, কিন্তু তাদের মূল্য অনেক বেশি। শাওন ভাই আমার জীবনের তেমনই একজন মানুষ। হয়তো আগামী দিনে আমরা সবাই ভিন্ন ভিন্ন পথে হাঁটব, জীবন আমাদের ব্যস্ত করে তুলবে, দেখা-সাক্ষাৎও আগের মতো হবে না। কিন্তু কিছু মানুষকে কখনো ভোলা যায় না, কারণ তারা স্মৃতির নয়, হৃদয়ের অংশ হয়ে যায়।

আমার দীর্ঘ এই পাঁচ বছরের ছাত্রজীবনের গল্প যদি কোনোদিন লিখতে বসি, তাহলে সেখানে শাওন ভাইয়ের নামটি অবশ্যই থাকবে। কারণ তিনি শুধু আমাদের পাশে ছিলেন না, তিনি আমাদের পথচলাকে আরও সুন্দর করে তুলেছেন।

শেষে শুধু একটি কথাই বলতে চাই—আমি যেখানেই থাকি না কেন, যতদিন পর্যন্ত বেঁচে থাকব, শাওন ভাইকে অনেক মিস করব। তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতা আজীবন অটুট থাকবে। আল্লাহ তাকে সবসময় সুস্থ রাখুন, ভালো রাখুন এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সফলতা দান করুন। আমাদের জীবনের গল্পে তিনি চিরকাল একজন প্রিয় মানুষ হয়েই থাকবেন।

প্রিয় পড়ার টেবিল, প্রিয় রুম 

মানুষ চলে যায়, কিন্তু কিছু জায়গা থেকে যায়। কিছু স্মৃতি কখনো পুরোনো হয় না, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি আপন হয়ে ওঠে। আমার অনার্স জীবনের দীর্ঘ পথচলায় এমন কিছু নীরব সঙ্গী ছিল, যাদের কথা না বললে আমার ছাত্রজীবনের গল্প কখনোই পূর্ণতা পাবে না। আজ আমি বলব আমার সেই প্রিয় পড়ার টেবিলের কথা, আমার সেই প্রিয় শোয়ার বেডের কথা, আমার প্রিয় রান্নাঘরের কথা এবং সর্বোপরি আমার সেই প্রিয় রুমটির কথা।

আমার পড়ার টেবিলটি ছিল শুধুই একটি আসবাব নয়, বরং আমার স্বপ্ন গড়ার একটি ছোট্ট কারখানা। এই টেবিলে বসেই আমি দীর্ঘ অনার্স জীবনের পড়াশোনা করেছি। কখনো রাত জেগে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছি, কখনো ভবিষ্যতের সুন্দর একটি জীবনের স্বপ্ন দেখেছি। কত ক্লান্তি, কত দুশ্চিন্তা আর কত আনন্দের মুহূর্ত যে এই টেবিলের সামনে কাটিয়েছি, তার কোনো হিসাব নেই। আমি সবসময় আমার পড়ার টেবিলটি সুন্দর করে গুছিয়ে রাখতাম। মনে হতো, আমার স্বপ্নগুলোও যেন ঠিক এই টেবিলের মতোই সুন্দর করে সাজানো রয়েছে।

আমার শোয়ার বেডটি ছিল আমার সমস্ত ক্লান্তির আশ্রয়স্থল। সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে যখন শরীর ও মন ক্লান্ত হয়ে পড়ত, তখন এই ছোট্ট বেডটিই আমাকে শান্তির পরশ দিত। কখনো আনন্দ নিয়ে ঘুমাতে গিয়েছি, আবার কখনো দুশ্চিন্তা নিয়ে। কিন্তু প্রতিটি সকালেই এই বেড আমাকে নতুন করে শুরু করার সাহস দিয়েছে।

আমার একটি নির্দিষ্ট দৈনিক রুটিন ছিল—খাওয়া-দাওয়া, পড়ার টেবিলে বসা, কিছুটা বিশ্রাম নেওয়া, আবার পড়াশোনা করা। এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলোই আমার অনার্স জীবনের সবচেয়ে বড় অংশ হয়ে উঠেছিল। আমার প্রিয় রান্নাঘরটিও এই গল্পের একটি অংশ। নিজের হাতে রান্না করা, কখনো ভালো হওয়া, কখনো একটু খারাপ হওয়া—সবকিছুই আজ আমার কাছে অমূল্য স্মৃতি।

আজ সেই প্রিয় রুমটি ঠিক আগের মতোই আছে। আমার প্রিয় পড়ার টেবিলটি হয়তো এখনো একই জায়গায় রয়েছে। আমার শোয়ার বেডটি আজও নীরবে অপেক্ষা করে আছে, রান্নাঘরটিও তার জায়গায় রয়েছে। সবকিছুই আছে, শুধু আমি—আল-আমিন—সেখানে নেই। আমি রুমটি ছেড়ে দিয়েছি, কিন্তু রুমটি আমাকে কখনো ছেড়ে যাবে না।

আজ বুঝতে পারছি, একটি রুম শুধু থাকার জায়গা নয়; এটি মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও স্মৃতির এক নীরব সাক্ষী। এই রুম আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে স্বপ্ন দেখতে হয়, কীভাবে সংগ্রাম করতে হয় এবং কীভাবে অল্পতেই সুখ খুঁজে নিতে হয়।

হয়তো আগামী দিনে আমি নতুন কোনো ঠিকানায় থাকব, নতুন একটি পড়ার টেবিল হবে, নতুন একটি বেড হবে। কিন্তু আমার এই প্রিয় রুম, আমার প্রিয় পড়ার টেবিল, আমার প্রিয় শোয়ার বেড এবং আমার সেই ছোট্ট রান্নাঘরের জায়গা কেউ কখনো নিতে পারবে না।

যতদিন আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রাখবেন, ততদিন আমার ছাত্রজীবনের এই সুন্দর দিনগুলো আমার হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকবে। আমি রুমটি ছেড়ে এসেছি, কিন্তু আমার একটি অংশ আজও সেখানে রয়ে গেছে—আমার স্মৃতির হয়ে, আমার ভালোবাসার হয়ে।

সবশেষে আজ বিদায়ের এই মুহূর্তে ফিরে তাকালে মনে হয়, আমরা শুধু কয়েকটি বছর একসঙ্গে কাটাইনি; আমরা একসঙ্গে একটি পরিবারের গল্প লিখেছি। হয়তো আগামী দিনে আমাদের পথ আলাদা হয়ে যাবে, নতুন ঠিকানা হবে, নতুন মানুষ আসবে জীবনে। কিন্তু এই রুমের প্রতিটি দেয়াল সাক্ষী হয়ে থাকবে আমাদের হাসি, আমাদের সংগ্রাম এবং আমাদের অকৃত্রিম বন্ধুত্বের।

শেষে শুধু একটি কথাই বলতে চাই—মানুষ হয়তো বিদায় নেয়, কিন্তু স্মৃতির কখনো বিদায় হয় না। আমাদের এই ছোট্ট রুম, আমাদের একসঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত এবং একে অপরের প্রতি ভালোবাসা আজীবন আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।

বিদায় কোনো সমাপ্তি নয়, বরং নতুন পথ

চলার সূচনা। আমাদের সম্পর্ক যেন সময়ের সীমানা পেরিয়ে চিরকাল অটুট থাকে।

Post a Comment

Please Select Embedded Mode To Show The Comment System.*

Previous Post Next Post